আজ বৃহস্পতিবার, ১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে পাসপোর্ট অফিস মুদি দোকানেও পাসপোর্ট করে!

বিল্লাল আহমেদ ও মমিনুল  ইসলামঃ
কথায় আছে টাকা হলে সোনার হরিণও পাওয়া যায়। ঠিক তেমনি টাকা হলেই পাওয়া যাচ্ছে যে কোন ঠিকানায় রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ পাসপোর্ট। টাকা দিলেই হাতে পাওয়া যায় পাসপোর্ট। পাসপোর্ট অফিসের দালালদের সাথে যোগাযোগ করলেই অসম্ভব সবকিছু সম্ভব হয়ে যায়। এছাড়া যে কোন ঠিকানায় দালালরা করে দেয় পাসপোর্ট। আবেদনকারী দেশের যে কোন স্থানের মানুষ হলেই ভুয়া ঠিকানা ও জাল কাগজপত্র দিয়ে খুব সহজেই পাসপোর্ট বানাতে পারবেন দালালদের মাধ্যমে। কোন ব্যক্তি নতুন পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে যথাযথ নিযম অনুসরণ করে পাসপোর্ট অফিসে গেলে ঘটে যত ব্যত্যয়। তাঁদেরকে একাধিক বার ফিরিয়ে দেয়া হয় আবেদন ফরমে বিভিন্ন ভুল হয়েছে বলে।

কিন্তু দালালদের মাধ্যমে আবেদন ফরম প্রথম বার জমা দিলেই জমা নেয় পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারা। পাসর্পোট অফিসের বিভিন্ন অসাধু কর্মকর্তাদের খুশি করে প্রতিদিন লক্ষ্য টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে পাসপোর্ট অফিসের দালাল চক্রের সদস্যরা।

দালাল চক্র গুলোর সাথে সংযোগ রয়েছে পাসপোর্ট অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের নিয়োজিত পুলিশের সাথে।

পাসপোর্ট অফিস নয়, এটা যেন একটি বাজার। কি নেই এই বাজারে? ফার্মেসীর দোকানে রয়েছে কম্পিউটার, ফটো কপির মেশিন। মুদি দোকানেও পাসপোর্ট ফরম পূরণ করা হচ্ছে । যে কোন বয়সের মানুষদের দেখলেই দালালগুলো হাত ধরে টান দিচ্ছে! যাকে দেখছে তাকেই বলছে ভাই পাসপোর্ট করবেন! নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এটা কি পাসপোর্ট অফিস না অন্য কিছু? কারা আছে পাসপোর্ট অফিসের দালালদের সাথে? কেন এত দালালদের নামে বেনামে দোকান বানিয়েছে? আবাসিক বাড়ীকে দোকান বানিয়ে কেন ভাড়া দেয়? পাসপোর্ট অফিসের বাহিরে এত দালাল কিন্তু কি করে ভিতরে কর্মকর্তারা?

নারায়ণগঞ্জের জালকুড়িতে পাসপোর্ট কার্যালয়ের সামনে চলছে দালালদের রাজত্ব । পাসপোর্টের অফিসে গড়ে উঠেছে সঙ্গবদ্ধ দালাল চক্রের দল। সাধারন মানুষকে জিম্মি করে দালালরা প্রতিদিন অবৈধ ভাবে লক্ষ্য লক্ষ্য টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসর্পোট অফিস দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ। এ বিষয়ে ভিডিও প্রতিবেদন সংবাদচর্চার ইউটিউব চ্যানেলে। এছাড়া বিস্তারিত তথ্য অনুসন্ধান করছে সংবাচর্চার অপরাধ অনুসন্ধানী দল।

সরকারী ভাবে সাধারণ পাসপোর্ট এর জন্য তিন হাজার চারশত পঞ্চাশ টাকা নির্ধারন থাকলেও দালালরা ভুক্তভূগিদের কাছ থেকে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা নিচ্ছে ১ মাসে পাসপোর্ট দেয়ার কথা বলে। স্বাভাবিক ভাবে সাধারণ পাসপোর্ট আঠারো কার্যদিবসের মধ্যে প্রদানের কথা থাকলেও মাস পেরিয়ে যায় কিন্তু পাসপোর্ট হাতে পায়না ভুক্তভোগীরা। আর এ জন্য দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট করতে যায় সাধারণ মানুষ। এছাড়া অতি জরুরী পাসপোর্ট এর জন্য ছয় হাজার নয়শত টাকা নির্ধারন থাকলেও দালালরা ভুক্তভূগিদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে এগার হাজার টাকা পর্যন্ত।

শুধু টাকা নিয়েই ক্ষান্ত নন দালালরা। একজন ব্যক্তির পাসপোর্ট তৈরী করতে গিয়ে তারা ভুয়া ঠিকানা দেয়া , জাল সত্ব্যায়িত করে এমনকি বিপুল অর্থের বিনিময়ে জন্মসনদও বানিয়ে দেয় এই দালাল চক্র। প্রশাসনের নাকের ডগায় অসাধু এই চক্র তাঁদের কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ দিন যাবৎ জালকুড়ি এলাকায় দোকান বানিয়ে। সাধারণ মানুষের দাবি দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান করে মানুষের হয়রানি বন্ধ করা হোক।

জালকুড়ি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট করতে আসা ভুক্তভোগী, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমি দালাল ছাড়া ফরম জমা দিয়েছি। আমার পাসপোর্ট দেয়ার নির্ধারিত তারিখের বিশ দিন পার হয়ে গেলেও বই পাইনি। আরেকজন মহিলা বলেন দালাল ছাড়া ফরম জমা দিতে গিয়েছি কিন্তুু তারা আমাকে বার বার লাইন ধরতে বলে হয়রানী করছেন। অপর এক লোক অভিযোগ করেন দালাল না ধরায় তার নাম এবং পিতার নাম ভুল করে দিয়েছে অফিসের লোকেরা। বার বার ধরনা দিলেও তাঁরা তা সংশোধন করছেন না।

এছাড়া নারায়ণগঞ্জের রাকিবুল ইসলাম (ছদ্ম নাম), পেশায় চাকুরীজীবি। ২০১৪ সনে যাত্রাবাড়ী আঞ্চলিক পাসপোর্ট থেকে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট করেন। কিন্তু অনাকাঙ্খিতভাবে জন্ম সাল ভুল লিপিবদ্ধ হয়। পাসপোর্টের মেয়াদ ২০১৯ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল।

এ সময়ের মধ্যে তিনি জন্ম সনদ সংশোধন করে জাতীয় পরিচয়পত্র করেন। কিন্তু তিনি নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে পারে বয়স সংশোধন হয় না। হতাশ রাকিবুল ইসলাম কোন উপায়ন্তর না পেয়ে বিশেষ একজনের মাধ্যমে দালাল চক্রের সক্রিয় সদস্যের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে দালাল জানায়, হবে না এমন শব্দ তার ডিকশনারিতে নাই। বয়স সংশোধন করা যাবে কিন্তু ৮০ হাজার টাকা লাগবে । এছাড়া মুদি দোকানেও পাসপোট করছে।

এসকল অভিযোগের বিষয়ে পাসর্পোট অফিসের সামনে স্থানীয় দালাল আনিছ বলেন, আমি সৌদি আরবে ১৭ বছর পার করে এসেছি। নারায়ণগঞ্জের জালকুড়ি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বর্তমানে দালালি করি। আমি পাই মাত্র ৪ থেকে ৫’শ টাকা। দুই হাজার টাকার ভাগাভাগি করে পাসপোর্ট অফিসের লোকেরা এছাড়া পুলিশও পায় ভাগ।

আরেক পাসপোর্ট অফিসের দালাল আলমগীর হোসেনের সহকারি বলেন, ৬ হাজার টাকা নেই একমাসে। অনেক বেশি নেই। অন্যদের কাছে আরো বেশি টাকা নেই। পাসপোর্ট করলে আসেন না করলে নাই!

অভিযোগের বিষয়ে, নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মোঃ মাকছুদুর রহমান জানান, আমি আমার জায়গা থেকে কোন অনিয়ম হতে দেই না। সার্বক্ষনিক আমি মনিটরিং করি। অফিসের ভিতরে দালাল কেন অতিরিক্ত লোকজনকেও ঢুকতে দেয়া হয়না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, আসলে নারায়ণগঞ্জ একটি শিল্পাঞ্চল এখানে বিভিন্ন জেলার মানুষ আসে তাই তাদের কর্মস্থল হিসেবে তারা এখান থেকে পাসপোর্ট করাতে পারে। দালালদের সাথে আমার অফিসের কোন কর্মকর্তা জড়িত না। যদি সাক্ষ্য প্রমানসহ অভিযোগ পাওয়া যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।